আসাদুল্লাহিল গালিব হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার আত্মত্যাগের বিরল দৃষ্টান্ত
হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র হযরত আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের অন্যতম। কুরাঈশ বংশের হাশেমী শাখায় উনার বিলাদত শরীফ। পিতৃকুল ও মাতৃকুল উভয় দিক থেকে তিনি কুরাঈশ বংশোদ্ভূত। সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মতে তিনি পবিত্র রমাদ্বান শরীফ উনার ১৭ তারিখ পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন। তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত চাচাতো ভাই। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নুবুওওয়াত প্রকাশের দশ বছর পূর্বে পবিত্র বিলাদত শরীফ গ্রহণ করেন। পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণকালে উনার বয়স মুবারক দশ বছর ছিল। তিনি হলেন সর্বসম্মতিক্রমে বালক উনাদের মধ্যে সর্বপ্রথম পবিত্র দ্বীন ইসলাম কবুলকারী। উম্মু আবিহা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার সম্মানিত খিদমত মুবারক করেন। অর্থাৎ উনাকে পবিত্র শাদী মুবারক করেন যে তারিখে তা হচ্ছে দ্বিতীয় হিজরীর যিলহজ্জ মাস অর্থাৎ হিজরী সালের দ্বিতীয় বর্ষ বদরের জিহাদের কিছুদিন পর। সম্মানিত ইসলামী খিলাফত উনার দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম এবং হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম এবং হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনাদের খিলাফত আমলে পরামর্শদাতা ছিলেন। হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদত গ্রহণের পর হিজরী ৩৫ সনে খিলাফতের মসনদে সমাসীন হন। প্রায় চার বছর সাড়ে আট মাস যাবৎ এ দায়িত্ব যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালন করেন। পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার মধ্যে হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার অবদান অপরিসীম। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যামানার সমস্ত জিহাদে অনেক বেশি সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় তিনিই দেন। এ কারণে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনাকে ‘হায়দার’ লক্ববসহ ‘যুলফিকার’ নামক একখানা তরবারি মুবারক হাদিয়া করেন। একমাত্র তাবুক অভিযান ছাড়া সমস্ত জিহাদেই তিনি অংশগ্রহণ করেন। পবিত্র বদর জিহাদে উনার সাদা পশমী রুমালের জন্য তিনি ছিলেন বিখ্যাত। পবিত্র বদর জিহাদসহ প্রতিটি জিহাদে তিনি ছিলেন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পতাকাবাহী। সুবহানাল্লাহ! মহান আল্লাহ পাক তিনি গণী, উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি গণী, উনার আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনারাও গণী। সুবহানাল্লাহ! কিন্তু মানুষ সেটার অপব্যাখ্যা করে থাকে। একটা ওয়াকিয়া উল্লেখ করা যেতে পারে- নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাশরীফ নিয়েছেন। এখন মেহমানদারী করতে হবে। মেহমানদারী করবেন, উনারা তো সবসময় মেহমানদারী করতেছেন। কোনো সায়িল বা সুওয়ালকারী কোনো কিছু চাইলে উনারা সবই দিয়ে দেন। সুবহানাল্লাহ! এত উনারা দান-খয়রাত করতেন। সুবহানাল্লাহ! এখন হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি চিন্তা করলেন, তাহলে কিছু তো বাজার থেকে মেহমানদারীর জন্য আনা প্রয়োজন। তিনি রওয়ানা হলেন, যখন বাজারের দরজার মুখে গেলেন একজন ব্যক্তি একটা ঘোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি চিন্তা করলেন টাকা-পয়সার কোনো একটা ব্যবস্থা করবেন, কারো কাছ থেকে হয়তো কর্জ নিবেন অথবা অন্য কোনভাবে একটা ব্যবস্থা করবেন। এমতাবস্থায় ওই ঘোড়াওয়ালা ব্যক্তি ডেকে বলতেছেন, হে হযরত আলাইহিস সালাম! আপনি কি আমার এই ঘোড়াটা খরিদ করবেন? হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, আমি যে আপনার ঘোড়া খরিদ করবো সে লক্ষ্যে আমি তো কোনো টাকা পয়সা আনিনি। তখন ওই ব্যক্তি জাওয়াব দিলেন যে, এখন আমাকে নগদ টাকা-পয়সা না দিলেও চলবে, ঘোড়াটা বিক্রি করে টাকা-পয়সা দিলেও চলবে। কত এটার মূল্য রয়েছে? ছয় দিনার। ঠিক আছে। উনি সেটা নিয়ে রওয়ানা দিলেন, বাজারের ভিতরে প্রবেশ করলেন। আরেকজন ব্যক্তি নিজের থেকেই ডেকে বললেন, হে হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম! আপনি কি আপনার এই ঘোড়াটা বিক্রি করবেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি বিক্রি করার জন্য এনেছি। আপনার এটার মূল্য কত? স্বয়ং হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, আপনি কত দিয়ে নিবেন? ওই ব্যক্তি নিজ থেকে বললেন, আমি দশ দিনার দিবো। তিনি বললেন, ঠিক আছে! এখন উনি দশ দিনার নিয়ে ওই ব্যক্তির ছয় দিনার পরিশোধ করে অবশিষ্ট চার দিনার যা লাভ করলেন সেটা দিয়ে কিছু খাদ্য দ্রব্য কিনে সরাসরি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খিদমতে পৌঁছলেন। অর্থাৎ উনার খিদমতে পেশ করলেন। যখন খিদমতে পেশ করা হলো, খাবারের জন্য দেয়া হলো তখন স্বয়ং হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি হাসতে হাসতে বলতেছিলেন, ইয়া রসূলাল্লাহু ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আজকে একটা ঘটনা ঘটেছে। কি ঘটনা ঘটেছে? নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কিন্তু সবকিছু জানেন। হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, আপনি যখন তাশরীফ এনেছেন আমাদের এখানে, তখন তো আপনার মেহমানদারী করার জন্য কিছু প্রয়োজন রয়েছে। বাজারে গিয়েছিলাম মেহমানদারীর ব্যবস্থা করা যায় কিনা। হঠাৎ গিয়ে দেখলাম বাজারের মোড়ে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছেন একটা ঘোড়া নিয়ে। সে ব্যক্তি আমাকে বলতেছেন যে, আপনি কি ঘোড়াটা খরিদ করবেন? হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, আমার কাছে তো টাকা-পয়সা নেই কিভাবে খরিদ করবো? সে ব্যক্তি বললেন, আপনি বাকিতে নিয়ে যান। আমি বাকিতে নিলাম। কত? ছয় দিনার। এখন বাজারে প্রবেশ করতে না করতেই একজন লোক এসে বললো: আপনি কি এটা বিক্রি করবেন? আমি বললাম: হ্যাঁ, কত দিয়ে কিনবেন আপনি? কত মূল্য? সে ব্যক্তি নিজ থেকে বললো দশ দিনার। আমি দশ দিনার বিক্রি করে ছয় দিনার দিয়ে ঋণ শোধ করে চার দিনার দিয়ে আপনার জন্য কিছু মুবারক খাদ্যদ্রব্য নিয়ে এসেছি। সুবহানাল্লাহ! নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হাসতে হাসতে বললেন যে, আসলে হে হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম! আপনি লোক দুটিকে চিনেছেন কি? তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমি তো উনাদেরকে চিনতে পারিনি। তখন স্বয়ং নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, আসলে যেহেতু আমি আপনাদের পবিত্র হুজরা শরীফ উনার মধ্যে তাশরীফ এনেছি তাই আমার মেহমানদারী আপনারা করবেন। ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেছেন আপনারা। এখন কিভাবে করবেন, চিন্তিত হয়ে গেছেন। এখন এখানে দুটি বিষয় একটা হচ্ছে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মেহমানদারী তো অবশ্যই করতে হবে, এটা ফরয-ওয়াজিব। আবার এদিকে সাইয়্যিদাতুন নিসা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি চিন্তিত হয়ে গেছেন, সাইয়্যিদাতুন নিসা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি চিন্তিত থাকুন এই বিষয়টা মহান আল্লাহ পাক তিনি সেটা পছন্দ করেন না। সেজন্য কি করলেন সাথে সাথে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম উনাকে একটা ঘোড়া দিয়ে পাঠালেন যে, আপনি যান এই ঘোড়াটা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি বাজারে আসতেছেন কিছু খাদ্যদ্রব্য কেনার জন্য। আপনি ঘোড়াটা নিয়ে যান যেয়ে বলবেন, আপনি কি ঘোড়াটা খরিদ করবেন? হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি যদি রাজি হন তাহলে আপনি বাকিতে ছয় দিনার বিক্রি করবেন। আর পিছনে রয়ে গেলেন হযরত মীকাইল আলাইহিস সালাম তিনি দশ দিনার নিয়ে অপেক্ষা করতেছেন। তিনি যখন বাজারে প্রবেশ করবেন ঘোড়াটি নিয়ে তখন আপনি বলবেন, আপনি বিক্রি করবেন? তিনি বলবেন, হ্যাঁ। তাহলে আপনি উনাকে দশ দিনার দিয়ে দিবেন তিনি দশ দিনার নিয়ে ছয় দিনার শোধ করবেন। চার দিনার থাকবে তা দিয়ে তিনি খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যাবেন। সুবহানাল্লাহ! স্বয়ং নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, একজন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম আর একজন হযরত মীকাইল আলাইহিস সালাম উনাদেরকে মহান আল্লাহ পাক তিনি পাঠিয়েছেন আপনাকে এই চার দিনার হাদিয়া দেয়ার জন্য। সুবহানাল্লাহ! এখন বিষয়টা খুব সূক্ষ্ম বিষয়। এর মধ্যে অনেক ইবরত-নছীহত রয়েছে। একদিক থেকে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক খিদমতের আঞ্জাম দেয়া ফরয-ওয়াজিব। আরেক দিক থেকে উনারা চিন্তিত। মহান আল্লাহ পাক তিনি বরদাশত করলেন না। উনারা চিন্তিত থাকবেন এটা কি করে হতে পারে। উনাদেরকে চিন্তা মুক্ত করতে হবে সেজন্য মহান আল্লাহ পাক তিনি স্বয়ং হাদিয়া পাঠিয়ে দিলেন। সুবহানাল্লাহ!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন