হাবশায় সম্মানিত হিজরত মুবারক
| আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত নুবুওওয়াত মুবারক প্রকাশ পাওয়ার ৫ম সালের কথা। মুশরিকরা হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের উপর যুলুমের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তাদের অভিপ্রায় ছিলো এর মাধ্যমে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনাকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। না‘ঊযুবিল্লাহ! তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কিছু সংখ্যক হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে হাবশায় (আবিসিনিয়ায়) হিজরত মুবারক করার অনুমতি মুবারক দেন। ওই সময় হাবশার বাদশাহ ছিলেন নাজ্জাশী। তিনি ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নাজ্জাশীর প্রশংসা মুবারক করেছেন। সুবহানাল্লাহ! এই সম্পর্কে কিতাবে বর্ণিত রয়েছে, قَالَ لَـهُمْ لَوْ خَرَجْتُمْ اِلـٰى اَرْضِ الْـحَبَشَةِ فَاِنَّ بِـهَا مَلِكًا لَّا يُظْلَمُ عِنْدَهٗ اَحَدٌ وَّهِىَ اَرْضُ صِدْقٍ حَتّٰى يـَجْعَلَ اللهُ لَكُمْ فَرَجًا مِّـمَّا اَنْتُمْ فِيْهِ. অর্থ: “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ মুবারক করেন, আপনারা যদি হাবশায় চলে যেতেন, তাহলে ভালো হতো। কারণ, সেখানে একজন বাদশাহ রয়েছেন যিনি কারো প্রতি যুলুম করেন না। এবং সেটি একটি ভালো রাজ্য। ওখানে গেলে মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনাদেরকে এই যুলুম-নির্যাতন থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করে দিবেন।” (আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৪/১৬৬) তখন একদল হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহুম উনারা হাবশায় সম্মানিত হিজরত মুবারক করেন। কিতাবে বর্ণিত রয়েছে, فَكَانَتْ اَوَّلَ هِجْرَةٍ كَانَتْ فِى الْاِسْلَامِ فَكَانَ اَوَّلَ مَنْ خَرَجَ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ حَضْرَتْ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَزَوْجَتُهٗ سَيِّدَتُنَا حَضْرَتْ رُقَيَّةُ بِنْتُ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. অর্থ: “এটি ছিলো সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার প্রথম হিজরত মুবারক। আর সম্মানিত মুসলামন উনাদের মধ্যে প্রথমে যাঁরা (সম্মানিত হিজরত মুবারক-এ) বের হলেন, উনারা হলেন সাইয়্যিদুনা হযরত উছমান ইবনে আফফান যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনি এবং উনার যাওযাতুম মুকাররমাহ সাইয়্যিদাতুনা হযরত রুকাইয়্যাতু বিনতু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আছ ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনারা।” সুবহানাল্লাহ! (বিদায়াহ-নিহায়াহ ৪/১৬৬-১৬৭) উনাদের সাথে উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মু সালামা আলাইহাস সালাম তিনিসহ আরো অনেকেই ছিলেন। তবে ওই সম্মানিত কাফিলা মুবারক-এ মোট কতজন সদস্য ছিলেন, এই বিষয়ে অনেক ইখতিলাফ রয়েছে। যেমন, ১০ জন, ১২ জন, ১৪ জন, ১৫ জন, ১৬ জন, ১৭ জন এরূপ বিভিন্ন জন বিভিন্ন মত পেশ করেছেন। সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনি যখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট হাবশায় হিজরত করার অনুমতি প্রার্থনা করেন, তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, اُخْرُجْ بـِحَضْرَتْ رُقَيَّةَ عَلَيْهَا السَّلَامُ مَعَكَ অর্থ: “আপনি সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনাকেসহ হাবশায় সম্মানিত হিজরত মুবারক করুন।” (মুস্তাদরকে হাকিম ৪/৫০) সম্মানিত হিজরত মুবারক উনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা: আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত নুবুওওয়াত মুবারক প্রকাশ পাওয়ার ৫ম বৎসরের সম্মানিত রজবুল হারাম শরীফ মাসের কথা। একটি সম্মানিত কাফিলা মুবারক মক্কাবাসীদের দৃষ্টি এড়ানোর জন্য রাতের আঁধারে সম্মানিত মক্কা শরীফ ত্যাগ করেন। উনাদের গন্তব্য হাবশা। সেই সম্মানিত কাফিলা মুবারক উনার মূল মধ্যমণি ছিলেন সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম তিনি। সুবহানাল্লাহ! তিনি উনার মহাসম্মানিত আব্বাজান নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং মহাসম্মানিতা আম্মাজান সাইয়্যিদাতুনা হযরত কুবরা আলাইহাস সালাম উনাদের থেকে বিদায় নেয়ার সময় যেমন অজস্র ধারায় সম্মানিত নূরুল মুহব্বত মুবারক প্রবাহিত করেন, ঠিক তেমনিভাবে উনারাও উনাদের লখতে জিগার উনাকে বিদায় দেয়ার সময় অজস্র ধারায় সম্মানিত নূরুল মুহব্বত মুবারক প্রবাহিত করেন। সুবহানাল্লাহ! তখন সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনার সম্মানিত বয়স মুবারক ছিলো ১১ বছর প্রায় সাড়ে ৩ মাস। এই অল্প বয়স মুবারক-এ হযরত আব্বা-আম্মা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদেরকে ছেড়ে সপরিবারে হিজরত মুবারক করে তিনি কায়িনাতের মাঝে এক বেমেছাল দৃষ্টান্ত মুবারক স্থাপন করেছেন। তিনি সমস্ত জিন-ইনসান, তামাম কায়িনাতবাসীকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, কিভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের মাঝে ফানা-বাক্বা হতে হয়। সুবহানাল্লাহ! মূলত, উনার কাছ থেকেই হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা হাক্বীক্বীভাবে ফানা-বাক্বা হওয়ার বিষয়টি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। সুবহানাল্লাহ! মুশরিকদের ষড়যন্ত্র : সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনাদের সম্মানিত কাফিলা মুবারক অতি গোপনে এসে শু‘আইবাহ বন্দরে পৌঁছলেন। উনাদের মধ্যে কেউ হেঁটে আবার কেউ বা বাহন মুবারক-এ চড়ে এসেছেন। মহান আল্লাহ পাক উনার সম্মানিত কুদরত মুবারক যে, উনারা শু‘আইবাহ বন্দরে পৌঁছেই সেখানে দুটি (ছোট) বাণিজ্যিক জাহাজ দেখতে পেলেন। ওগুলো বন্দর ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। আবিসিনিয়ার বন্দর পর্যন্ত যাওয়ার জন্য উনাদের নিকট যুক্তিসঙ্গত ভাড়া দাবি করলো। কিতাবে বর্ণিত রয়েছে, فَوَفَّقَ اللهُ لَـهُمْ سَفِيْنَتَيْنِ لِلتُّجَّارِ حَـمَلُوْهُمْ فِيْهِمَا بِنِصْفِ دِيْنَارٍ অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক তিনি সেই সময় উনাদের উপর খাছ গাইবী মদদ (সাহায্য) মুবারক করেন। উনারা সেখানে (শু‘আইবাহ বন্দরে) এসে দুইটি (ছোট) বাণিজ্যিক জাহাজ দেখতে পান। তারা (বণিকেরা) অর্ধ দীনারের বিনিময়ে উনাদেরকে জাহাজ দুটিতে তুলে নিলো।” (‘উয়ূনুল আছার, সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ, তারীখে ত্ববারী ইত্যাদি) জাহাজ বন্দর ছেড়ে দেয়ার পর একজন মহিলা সম্মানিত মক্কা শরীফ-এ এসে মক্কাবাসীদেরকে বললো যে, সে সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনাকে এবং সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনাদেরকে শু‘আইবাহ বন্দরের দিকে যেতে দেখেছে। মুশরিকরা যখন উনাদের সম্মানিত হিজরত মুবারক করার প্রচেষ্টা সম্পর্কে জানতে পারলো, তখন তারা হতাশ হলো। সম্মানিত হিজরতকারী উনাদেরকে বিশেষ করে সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনাকে এবং সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনাদেরকে বাধা দেয়ার জন্য একদল যোদ্ধা পাঠালো। কিন্তু অন্যান্য হিজরতকারীদের সাথে উনারা দুইজন শু‘আইবাহ বন্দর বহু পূর্বেই ছেড়ে গেছেন। সুবহানাল্লাহ! হাবশায় অবতরণ: কিতাবে বর্ণিত রয়েছে, সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনাদের সম্মানিত কাফিলা মুবারক দীর্ঘ এক মাস পর সম্মানিত শা’বান মাসে হাবশায় যেয়ে পৌঁছেন। সুবাহানল্লাহ! উনারা সেখানে যেয়ে নিরাপদে মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদাত-বন্দেগী করতে থাকেন এবং তা’লীম-তালক্বীন ও সম্মানিত ছোহবত মুবারক দানের মাধ্যমে লোকদেরকে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার দিকে আহ্বান করতে থাকেন। সুবহানাল্লাহ! উনাদের আহ্বানে বহু লোক ঈমান এনে মুসলমান হয়ে যান। এভাবে সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনার মুবারক পদচারণা, সম্মানিত তা’লীম-তালক্বীন ও সম্মানিত ছোহবত মুবারক উনার মাধ্যমে হাবশার যমীনে তথা অনারবে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার আলো ছড়িয়ে পড়ে। সুবহানাল্লাহ! আর তার পাশাপাশি হাবশাসহ সমগ্র অনারব রহমত, বরকত, সাকীনাহ ও নিয়ামত মুবারক লাভে ধন্য হয়। সুবহানাল্লাহ! তাহলে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনার সম্মানিত অবদান মুবারক কত বেমেছাল, তা এখান থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। সুবহানাল্লাহ! মহান আল্লাহ পাক উনার পথে সম্মানিত হিজরতকারী সম্মানিত প্রথম পরিবার: সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম তিনি এবং সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনারা যখন হাবশায় (আবিসিনিয়ায়) সম্মানিত হিজরত মুবারক করেন, তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনাদের সম্মানিত খুছূছিয়াত মুবারক সম্পর্কে ইরশাদ মুবারক করেন, اِنَّهُمَا لَاَوَّلُ مَنْ هَاجَرَ بَعْدَ حَضْرَتْ لُوْطٍ وَّحَضْرَتْ اِبْرَاهِيْمَ عَلَيْهِمَا الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ. অর্থ: “নিশ্চয়ই সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম তিনি এবং হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনারাই হচ্ছেন হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার এবং হযরত লূত আলাইহিস সালাম উনাদের পর সর্বপ্রথম হিজরতকারী।” সুবহানাল্লাহ!’ (মুস্তাদরকে হাকিম ৪/৫০) সম্মানিত হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, عَنْ حَضْرَتْ اَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالـٰى عَنْهُ قَالَ خَرَجَ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَمَعَهٗ حَضْرَتْ رُقَيَّةُ بِنْتُ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِلٰـى اَرْضِ الْـحَبَشَةِ فَاَبْطَأَ خَبَرُهُمْ عَلـٰى رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدِمَتِ امْرَاَةٌ مِّنْ قُرَيْشٍ فَقَالَتْ يَا مُحَمَّدُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ رَأَيْتُ خَتَنَكَ وَمَعَهُ امْرَأَتُهٗ قَالَ عَلـٰى اَىِّ حَالٍ رَاَيْتِهِمَا قَالَتْ رَأَيْتُهٗ قَدْ حَمَلَ امْرَاَتَهٗ عَلـٰى حِمَارٍ مِّنْ هٰذِهِ الدَّبَّابَةِ وَهُوَ يَسُوْقُهَا فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَحِبَهُمَا اللهُ تَعَالـٰى اِنَّ حَضْرَتْ عُثْمَانَ عَلَيْهِ السَّلامُ لَاَوَّلُ مَنْ هَاجَرَ اِلَى اللهِ تَعَالـٰى بِاَهْلِهٖ بَعْدَ حَضْرَتْ لُوْطٍ عَلَيْهِ السَّلامُ অর্থ: “হযরত আনাস বিন মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিতা বানাত সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনাকে নিয়ে হাবশায় সম্মানিত হিজরত মুবারক-এ গেলেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট উনাদের সংবাদ মুবারক আসতে দেরি হয়ে গেলো। এর মধ্যে একজন কুরাইশী মহিলা হাবশা থেকে সম্মানিত মক্কা শরীফ এলেন। তিনি বললেন, আমি আপনার সম্মানিত জামাতা উনাকে উনার মহাসম্মানিতা যাওজাতুম মুকাররমাহ তথা সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনার সাথে দেখেছি। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি জানতে চাইলেন, আপনি উনাদেরকে কী অবস্থায় দেখেছেন? তিনি বললেন, আমি দেখেছি সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনি সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনাকে একটি ছোট গাধার উপর বসিয়ে (গাধাটিকে) হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, صَحِبَهُمَا اللهُ تَعَالـٰى اِنَّ حَضْرَتْ عُثْمَانَ عَلَيْهِ السَّلامُ لَاَوَّلُ مَنْ هَاجَرَ اِلَى اللهِ تَعَالـٰى بِاَهْلِهٖ بَعْدَ حَضْرَتْ لُوْطٍ عَلَيْهِ السَّلامُ “মহান আল্লাহ পাক তিনি উনাদের দু’জনের সাথী হোন। নিশ্চয়ই হযরত লূত আলাইহিস সালাম উনার পর হযরত যূন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সপরিবারে সম্মানিত হিজরত মুবারক করেছেন।” সুবহানাল্লহ! (আল আহাদ ওয়াল মাছানী ১/১৪৭, আস সুন্নাহ ২/৫৯৬, দালাইলুন নুবুওওয়াহ ২/২৯৭, মা’রিফাতুছ ছাহাবাহ লিআবী নাঈম ২২/২২৬, আল মাত্বালিবুল আলিয়াহ ১৬/৫৩, উসদুল গবাহ ৩/৩৫২, বিদায়াহ-নিহায়াহ ৩/৮৫, তারীখুল ইসলাম লিযযাহাবী ১/১৮৩ ইত্যাদি) হাবশায় অবস্থান মুবারক: সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের রেযামন্দি-সন্তুষ্টি মুবারক হাছিলের লক্ষ্যে স্বদেশ ত্যাগ করে সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার সাথে সুদূর হাবশায় অবস্থান মুবারক করতে থাকেন। হাবশায় অবস্থানকালে উনার একজন মহাসম্মানিত আওলাদ আলাইহিস সালাম তিনি দুনিয়ার যমীনে মহাসম্মানিত বরকতময় বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। সুবহানাল্লাহ! মহাসম্মানিত বরকতময় বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের সপ্তম দিনে উনার সম্মানিত আক্বীক্বাহ মুবারক দেয়া হয় এবং উনার নাম মুবারক রাখা হয় ‘সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আব্দুল্লাহ আলাইহিস সালাম’। সুবহানাল্লাহ! উনার সম্মানিত নাম মুবারক অনুযায়ী সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম তিনি সম্মানিত কুনিয়াত মুবারক গ্রহণ করেন ‘উম্মু আব্দিল্লাহ আলাইহাস সালাম’ এবং সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনি সম্মানিত কুনিয়াত মুবারক গ্রহণ করেন ‘আবূ আব্দিল্লাহ আলাইহিস সালাম’। সুবহানাল্লাহ! মুজাদ্দিদে আ’যম সম্মানিত রাজারবাগ শরীফ উনার মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা ইমাম খলীফাতুল্লাহ হযরত আস সাফফাহ আলাইহিছ ছলাতু ওয়াস সালাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “যখন সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম আব্দুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি দুনিয়ার যমীনে মহাসম্মানিত বরকতময় বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেন, তখন দুনিয়াবী জিন্দেগী মুবারক অনুযায়ী নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বয়স মুবারক ৫১ বছর চলাকালীন আর সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনার সম্মানিত বয়স মুবারক ১৮ বছর চলাকালীন।” সুবহানাল্লাহ! সম্মানিত কারামাত মুবারক উনার বহিঃপ্রকাশ: কিতাবে বর্ণিত রয়েছে, وَكَانَتْ ذَاتَ جَمَالٍ رَائِعٍ ذَكَرَ ابْنُ قُدَامَةَ اَنَّ نَفَرًا مِّنَ الْـحَبَشَةِ كَانُوْا يَنْظُرُوْنَ اِلَيْهَا وَيَعْجَبُوْنَ مِنْ جَمَالِـهَا فَتَاَذَّتْ مِنْ ذٰلِكَ فَدَعَتْ عَلَيْهِمْ فَهَلَكُوْا جَمِيْعًا. অর্থ: “সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম তিনি ছিলেন অতি বিস্ময়কর বেমেছাল খুবছূরত মুবারক উনার অধিকারিণী। হযরত ইমাম ইবনে কুদামাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উল্লেখ করেছেন যে, হাবশার এক দল লোক উনার দিকে তাকাতো এবং উনার সম্মানিত ছূরত মুবারক-এ অভিভূত হয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতো। এতে তিনি খুব কষ্ট পেতেন। ফলে তিনি তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেন এবং তারা সকলেই ধ্বংস হয়ে যায়।” সুবহানাল্লাহ! (শারহুয যারক্বানী ‘আলাল মাওয়াহিব ৪/২৩৩) কিতাবে আরো বর্ণিত রয়েছে, اَنَّ فِتْيَانَ اَهْلِ الْـحَبَشَةِ كَانُوْا يُعْرِضُوْنَ لِلسَّيِّدَةِ رُقَيَّةَ عَلَيْهَا السَّلَامُ وَيَنْظُرُوْنَ اِلَيْهَا وَيَعْجَبُوْنَ مِنْ جَمَالِـهَا فَاٰذَاهَا ذٰلِكَ فَدَعَتْ عَلَيْهِمْ جَمِيْعًا فَهَلَكُوْا. অর্থ: “নিশ্চয়ই হাবশার একদল যুবক তারা সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনাকে দেখার জন্য আসতো, উনার দিকে তাকিয়ে থাকতো এবং উনার সম্মানিত সৌন্দর্য মুবারক-এ অভিভূত হয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতো। এইভাবে তারা উনাকে কষ্ট দিতো। তাই তিনি তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেন। তারপর তারা সকলেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।” সুবহানাল্লাহ! (সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ ১১/৩৪) কিতাবে আরো বর্ণিত রয়েছে, “সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম তিনি ছিলেন মানুষের মাঝে সর্বাধিক সৌন্দর্য মুবারক উনার অধিকারিণী। সুবহানাল্লাহ! তিনি যখন হাবশায় অবস্থান মুবারক করছিলেন, তখন হাবশার একদল যুবক তারা সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনাকে দেখে বারবার উনার নিকট আসা যাওয়া করতো এবং উনার সম্মানিত সৌন্দর্য মুবারক-এ বিস্ময় প্রকাশ করতো। এতে তিনি খুব কষ্ট পেতেন। অতঃপর- قَتَلَهُمُ اللهُ فِى الْمَعْرَكَةِ لَمَّا سَارَ النَّجَاشِـىُّ اِلـٰى عَدُوِّهٖ অর্থ: “নাজ্জাশী যখন শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদে বের হয়েছিলেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি সেই জিহাদে এই সকল দুষ্ট লোকদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেন।” সুবহানাল্লাহ! (মুস্তাদরকে হাকিম ৪/৫১) অপর বর্ণনায় রয়েছে, فَقَتَلَهُمُ اللهُ جَمِيْعًا لَّـمْ يُفْلِتْ مِنْهُمْ اَحَدٌ. অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক তিনি তাদের প্রত্যেককেই নিশ্চিহ্ন করে দেন। তাদের কেউ এর (সেই খোদায়ী গযব) থেকে পরিত্রাণ পায়নি।” সুবহানাল্লাহ! (সীরাতে ইবনে ইসহাক্ব ১/২১৮) প্রকৃতপক্ষে সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম উনার সম্পূর্ণ জিন্দেগী মুবারকখানাই সম্মানিত কুদরত মুবারক, সম্মানিত মু’জিযা শরীফ এবং সম্মানিত কারামত মুবারক উনাদের অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ! তবে কেনো কোনো সময় উনার কোনো কোনো মহাসম্মানিত শান মুবারক প্রকাশ পেয়েছেন। সুবহানাল্লাহ! সম্মানিত মক্কা শরীফ প্রত্যাবর্তন: সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছানিয়াহ আলাইহাস সালাম তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার সাথে সুদীর্ঘ প্রায় ৭ বছর হাবশায় অবস্থান মুবারক করেন। এরপর উনাদের নিকট সংবাদ পৌঁছে যে, এখন সম্মানিত মক্কা শরীফ উনার অবস্থা ভালো হয়েছে। তখন উনারা সম্মানিত মক্কা শরীফ প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু উনারা এসে দেখলেন যে, সম্মানিত মক্কা শরীফ-এ এখন পূর্বের চেয়েও নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। |
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন