বুধবার, ২০ জুলাই, ২০১৬

সারাদেশে বাড়ছে ভুয়া ও অনুমোদনহীন বিশ্ববিদ্যালয় ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতারণার ফাঁদে হাজার হাজার শিক্ষার্থী নিয়ন্ত্রণের বাইরে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

সারাদেশে বাড়ছে ভুয়া ও অনুমোদনহীন বিশ্ববিদ্যালয় ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতারণার ফাঁদে হাজার হাজার শিক্ষার্থী নিয়ন্ত্রণের বাইরে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়


সম্প্রতি রাজধানীর মালিবাগের আমেরিকা-বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিপুল পরিমাণ নকল সার্টিফিকেট উদ্ধার করেছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। মালিবাগের ডিআইটি রোডের ১০৯ নম্বর বাড়িতে অভিযানটি চালিয়ে এসব সার্টিফিকেট জব্দ করা হয়। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান জানান, এটি একটি ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়। তারা দীর্ঘদিন ধরে অর্থের বিনিময়ে ভুয়া সার্টিফিকেট বিক্রি করে আসছে। এর কিছুদিন পূর্বে মাত্র ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিবিএ ও এমবিএ’র সার্টিফিকেট তৈরি ও বিক্রির অভিযোগে জেরিন ও মাকসুদা নামের নারীকে আটক করেছে র‌্যাব। এক প্রতিবেদন মতে, অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে ২০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। সারা দেশে এসব প্রতিষ্ঠানের ৩ শতাধিক ক্যাম্পাসও চলছে অবৈধভাবে। ক্যাম্পাসগুলোতে যেসব কোর্স ও প্রোগ্রাম পাঠ্য তাতেও নেই সরকারি অনুমোদন। শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, ‘বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে যারা নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে, তাদেরও সরকারি অনুমোদন নেই। প্রসঙ্গত উচ্চশিক্ষায় চলমান নানাবিধ প্রতারণা নিয়ে যেসব সংবাদ সাম্প্রতিক সময়ে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, নামসর্বস্ব ভুয়া বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ‘দূরশিক্ষণ’ পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া, উচ্চশিক্ষা বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রতারণা, অনুমোদনহীন ‘ভুয়া’ বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ খুলে শিক্ষার্থী ভর্তির পাঁয়তারা, মালিকানার দ্বন্দ্বে সৃষ্ট একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ক্যাম্পাস স্থাপন, আউটার ক্যাম্পাস বা শাখা ক্যাম্পাস খুলে প্রতারণা ইত্যাদি। উচ্চশিক্ষায় প্রতারণার বিষয়টি একেবারেই যে নতুন, তা নয়। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চশিক্ষায় এ ধরনের লাগামহীন প্রতারণা ও নির্লজ্জ বাণিজ্য চলে আসছে এবং চলছে। দেশে বিদ্যমান নানাবিধ প্রতারণার মিছিলে উচ্চশিক্ষাও যে শামিল হয়েছে বা শামিল হতে বাধ্য করা হয়েছে কিছু অসৎ মানুষ কর্তৃক সেটা এখন আর অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। প্রচলিত আইন কানুন বিদ্যমান এসব প্রতারণা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারায় এসব অরাজক পরিস্থিতির উন্নতিরও কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না । ফলে, দিনের পর দিন মানুষ প্রতারিত হয়েই চলছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা অবৈধ এবং চ্যান্সেলর হিসাবে মহামান্য রাষ্ট্রপতিই একমাত্র ভিসি নিয়োগ দেয়ার অধিকার রাখে। কিন্তু আমাদের দেশের অনেকে ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে নিজেকেই ভিসি হিসাবে প্রচার করছে। এছাড়া, কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার নামেও প্রতারণা করা হচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্পন্ন শিক্ষার ব্যাপারে আপস না করলেও বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আউটার ক্যাম্পাস, অননুমোদিত বা সরকার কর্তৃক বন্ধ ঘোষিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেয়ার পরিবর্তে অনবরত প্রতারণা করেই যাচ্ছে। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী আউটার ক্যাম্পাস ও দূরশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এসব অবৈধ শাখা থেকে মানুষ ডিগ্রি নিয়ে কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার করছে বা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এ ধরনের প্রতারণা রোধে প্রয়োজনীয় তদারকির অভাব বরাবরের মত পরিলক্ষিত হওয়ায় কিছু অসৎ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ছত্রচ্ছায়ায় এসব প্রতারণামূলক কর্মকা- বেড়েই চলছে। এসব ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। লাখ লাখ টাকা ও সময় ব্যয় করে সার্টিফিকেট পাওয়া কোন কাজে আসছে না। এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন দিয়ে বিভ্রান্ত করছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। শিক্ষার্থী ভিড়াতে নানা লোভনীয় প্রস্তাবও দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বলছে, এসব শিক্ষার্থীর দায়দায়িত্ব নিজেদেরকেই নিতে হবে। বর্তমানে দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ১০০টি। এর মধ্যে প্রায় দেড় ডজন ইউনিভার্সিটির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। রয়েছে একাধিক ট্রাস্টি বোর্ড ও ক্যাম্পাস। অর্থের বিনিময়ে এসব ক্যাম্পাস থেকে দেয়া হচ্ছে সার্টিফিকেট। আর তা নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কোন কাজে আসছে না। ইউজিসি বারবার সতর্ক করার পরও কান দিচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। মালিকানার দ্বন্দ্ব ও অবৈধ ক্যাম্পাস রয়েছে দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটি, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি, পিপলস ইউনিভার্সিটি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বিজি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটিতে। কোর্টের স্থগিতাদেশ নিয়ে চলছে কুইন্স ইউনিভার্সিটি। লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে সার্টিফিকেট নিয়ে বিপাকে পড়েছে দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এ বিশ্ববিদ্যালয়। সরকার একটি জায়গায় ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিলেও দেশব্যাপী প্রায় ৪৫০টি অবৈধ ক্যাম্পাস রয়েছে তাদের। এসব ক্যাম্পাস থেকে সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। রয়েছে চমকপ্রদ সাবজেক্ট। অথচ এসবের অনুমোদন নেই। সতর্ক করে ইউজিসি একাধিকবার গণবিজ্ঞপ্তিও দিয়েছে। কে শোনে কার কথা। মোমেনশাহী আনন্দমোহন কলেজের একজন ছাত্র দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটির সার্টিফিকেট নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগারিক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু তার এমপিও হয়নি। হতাশ ওই ছাত্র এখন বৈধ কোন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের সার্টিফিকেট অর্জনের পথ খুঁজছে। তার মতো হাজার হাজার শিক্ষার্থীর একই অবস্থা। অনেকে আবার দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটির সার্টিফিকেট নিয়ে চাকরির আবেদন করতে পারছে না। রাস্তায় রাস্তায় এখন আন্দোলন করছে। এ ইউনিভার্সিটির সার্টিফিকেট নিয়ে অ্যাডভোকেটশিপ এনরোলমেন্ট পরীক্ষার প্রবেশপত্র না পেয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে। বার কাউন্সিলে তালা দিয়েছে। পরীক্ষা আগে প্রবেশপত্র সংগ্রহ করতে না পেরে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। একাধিক পর্ষদের মাধ্যমে পরিচালিত দারুল ইহসানের কোন শাখাটি আসল তা নির্ধারণে হাইকোর্টে কয়েকটি রিট আবেদনও হয়েছে। একথা সত্য যে, গত দুই দশকে দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে কিন্তু প্রতারণামুক্ত ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা গেছে এমন দাবি যুক্তিসঙ্গত নয়। সেই সাথে প্রতারণার বিষয়টিও লাগামহীনভাবে বেড়েই চলছে যা অভিভাবক, শিক্ষার্থীসহ সচেতন মানুষদের আতংকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নামসর্বস্ব নানা প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থীদেরকে প্রতারিত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংকট, উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও বিদ্যমান বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে বিভিন্নভাবে প্রতারণা করে আসছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বলার অপেক্ষা রাখেনা, শিক্ষা ব্যবস্থা এভাবে চলতে পারে না। এসব বিষয় কঠোর হাতে দমন করা জরুরি। এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকদের প্রতিষ্ঠানের সরকারি অনুমোদনের বিষয়ে যথাযথ তথ্যানুসন্ধান করে ভর্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। অভিভাবকসহ নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের সচেতনতা ও সোচ্চার ভূমিকাই পারে এসব প্রতারণা রোধ করতে।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন